বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়াই আইন সংশোধনে মত দিয়েছে আইন কমিশন
মিলটন আনোয়ার
কয়েকদিন নানান বিবৃতি ও তোড়জোড়ের পর এখন বাজেট বরাদ্দের অজুহাতে শুরু হয়নি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া। আর যে আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে সেই আইন সংশোধনের মতামত চেয়ে আইন কমিশনের আহ্বানে সাড়া দেননি অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়াই নিজেরা মতামত দিয়ে গতকাল আইন কমিশন আইনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রস্তাব পাস হয় আর এরমধ্য দিয়েই নতুন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। বিচারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীদের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার।
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জানিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়নি, কিন্তু প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য অনেককে দেশত্যাগ না করতে সরকার নির্দেশ দিয়েছে। সরকরের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা আছে কিনা তা স্পষ্ট না করে আইনমন্ত্রী জানান, মামলা দায়ের হলেই যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা জানা যাবে। এদিকে সূত্রমতে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং ওয়্যার ক্রাইম ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফাইন্ডিং কমিটি সরকারের কাছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ১৭ হাজার ৭৫ জনের একটি তালিকা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে।
গত ৯ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্তসংস্থা, দু’সপ্তাহের মধ্যে প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আজ থেকে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো। সিআইডি, ডিজিএফআই, এনএসআই, রেবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংুক থেকে বাছাই করা ব্যঁিঋদর নিয়ে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা যায়। তদন্তকারী সংস্থার কাছে যুদ্ধাপরাধীদের একটি তালিকা দেবে সরকার। তাদের তদন্তের পরেই মামলা দায়ের করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ঁ। কিন্তু এরপরই তদন্ত কমিটি গঠন নিয়ে লুকোচুরি শুরু হয়। ১৯ এপ্রিল তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সেলের সদস্যদের নাম চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। সকালে প্রথম বৈঠক শেষে তারা দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠক করেন। এই বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের বাসভবনে আবারো বৈঠক বসে। সেই বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় জানানো হয় পরের দিন ২০ এপ্রিল নাম ঘোষণা করা হবে। ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। আইনমন্ত্রীও একটি সেমিনারে যোগ দিতে মধ্যপ্রাচ্যে যান।
২০ তারিখে জানানো হয়, আইনমন্ত্রী দেশে ফেরার পর তদন্ত সংস্থার নাম ঘোষণা করা হবে। ২৫ এপ্রিল আইনমন্ত্রী দেশে ফেরার পর আজ অবধি সেই নাম ঘোষণা করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তদন্তকারী সংস্থার সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হবে তাই সময় লাগছে। কখনো বলা হচ্ছে, বিচার যাতে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করে সেজন্য সময় লাগছে। আবার আইনমন্ত্রী বলছেন ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য জায়গা ও সহায়ক লোকবল নিয়োগের কারণে দেরি হচ্ছে।
এরমধ্যে আইন মন্ত্রণালয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সরকারের কাছে ১০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ চায়। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ ছিলো না। পরে আইনমন্ত্রী জানান, মন্ত্রী পরিষদ টাকা বরাদ্দের বিষয়ে একমত হয়েছে। কয়েকদিন আগে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, বাজেটে বরাদ্দকৃত টাকা পাওয়া গেলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে খবর নিয়ে জানা গেছে, এই মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ভেতরে কোনো তৎপরতা নেই। এদিকে যে আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে সেই আইনটি যুগোপযোগী করার জন্য মতামত চেয়ে আইন কমিশন বিশেষজ্ঞদের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিল তাতে মাত্র দুই জন তার মতামত দিয়েছে। আইনটি সংশোধনের ওপর মতামত চেয়ে আইন কমিশন মোট ৩৩ জনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল।
সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার হারুন উর রশিদ ছাড়া আর কেউ মতামত দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া নিজেরাই মতামত দিয়ে গতকাল আইন কমিশন আইনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে বলে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আ. রশিদ এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তবে আইন কমিশন কী মতামত দিয়েছে তা তিনি জানাতে অস্বীকার করেছেন।
তথ্যসূত্র : আমাদের সময়, বৃহস্পতিবার, ১১ আষাঢ় ১৪১৬, ২৫ জুন ২০০৯।
তথ্যলিংক : http://www.amadershomoy.com/content/2009/06/25/news0254.htm