যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কীভাবে হওয়া উচিত?
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যাদের ভূমিকার জন্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা যেতে পারে তাদের বিরূদ্ধে অন্য দেশে বিচার চাওয়ার ব্যাপারে সম্প্রতি একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। তার পরবর্তীতে এই ব্যাপারটি নিয়ে কেউ কেউ ব্যক্তিগত মেইল দিয়ে আমাকে তাদের চিন্তা-ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। তাদের চিন্তা-ভাবনা ও জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কীভাবে হওয়া উচিত তার নীতিমালা নিয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নীতিমালা ও আংশিক কার্যধারা নিয়ে যদি আমার ভাবনাগুলোকে সাজাই তাহলে মোটামুটি এমন হয়ঃ
১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টি কোন দল বা গোষ্ঠীর নয়। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই বিচার জরুরী, কারো উপর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নয় – এই কথাটি দেশে ও দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠা করা।
২. যুদ্ধাপরাধের বিচার করার যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ফলাফল, এর নৈতিক ভিত্তি সাধারণ জনগণের উপযুক্ত ভাষায় সকল প্রকার মিডিয়াতে প্রচার করা এবং জনসংযোগের মাধ্যমে তা জনমানসে প্রতিষ্ঠা করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠা করা।
এই দুই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইস্যুটি একটি জাতীয় ইস্যু ও গণদাবী সেটি প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। মানবতার স্বার্থে এবং অন্য দেশে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এটি প্রয়োজনীয়। অন্য দেশে বিচার বিরোধী শক্তি যেন পালটা কোন আন্দোলন বা জনমত গড়ে তুলতে না তার জন্যও এটি প্রয়োজন।
৩. বিচারের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির দলীয়, গোষ্ঠীগত, জাতিগত, ভাষাগত, জাতীয়তাগত, নাগরিকত্বগত প্রশ্ন বিবেচনা না করা।
এর মাধ্যমে বিচারকার্য যে নিরপেক্ষ ও ন্যায়ানুগ হচ্ছে তা নিশ্চিত করা যাবে। কোন বিশেষ দল করলেই অপরাধী আর অন্য কোন বিশেষ দল করলেই ইনডেমনিটি পাওয়া যাবে এমন ভ্রান্ত ধারণা নিরসন করা যাবে। বিশেষ জাতি-ভাষার মানুষ মাত্রই যুদ্ধাপরাধী এমন ভ্রান্ত ধারণাও নিরসন করা যাবে।
৪. বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়-কালের কার্যক্রমের উপরই কেবল বিচার কার্য হতে হবে। ঐসময়-কালের পূর্বে বা পরে অভিযুক্ত ব্যক্তির কার্যক্রম এই বিচারে বিবেচনা না করা।
৫. মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ ও তার নাগরিকদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাশকতা, হত্যা, হামলা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠির পরবর্তীকালে ভূমিকা বা অবস্থান যাই থাকুক না কেন তাদের ঐসময়কালের কার্যক্রমের জন্য বিচারের সন্মূখীন করা।
এই দুই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচারকার্যকে অহেতুক বিস্তৃত, দীর্ঘায়িত ও জটিল করা থেকে রক্ষা করা যাবে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কালে ভোল পালটানো দালালদের বিচার করাও সহজতর হবে।
৬. মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে সমর্থনদানকারী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর পূর্ববর্তী বা বর্তমান পরিচয় যাই হোকনা কেন তাদের বিরূদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনয়ণ করা।
৭. মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ ও তার নাগরিকদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাশকতা, হামলা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত দল বা গোষ্ঠির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এবং ঐসমস্ত দল বা গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কার্যক্রম খতিয়ে দেখা।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী এবং এই বিচার প্রক্রিয়া বিরোধী চক্রান্ত নস্যাৎ করা যাবে।
৮. ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সরকার ও তার বিধিকে কার্যকর ধরে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশী নাগরিকদের ক্ষেত্রে, এমনকি ভিনদেশীদের ক্ষেত্রে ফৌজদারী দণ্ডবিধির আওতায় বিচার করা যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা।
এর মাধ্যমে বিশেষ ধরণের আইন প্রণয়ন ছাড়াই অপরাধীদের সাধারণ আদালত, দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল ইত্যাদি আদালতে বিচার করা সম্ভব হবে।
৯. নির্বিঘ্নে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা, সংযোজন করা বা বিয়োজন করার ব্যবস্থা করা।
১০. এই বিচারের জন্য সংবিধানে কোন সংশোধনী প্রয়োজন হলে তা সংসদে উত্থাপনের ব্যবস্থা করা।
১১. দ্রুত বিচারকার্য সংঘটনের জন্য প্রয়োজনীয় বিচারিক আদালত (ভৌত অবকাঠামো নয়) প্রতিষ্ঠা করা, বিচারক ও বিচারপতি নিয়োগ প্রদান।
এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে মসৃন ও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
১২. এক ব্যক্তির বিরূদ্ধে একাধিক অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রতিটি অপরাধের জন্য স্বতন্ত্র মামলা করা। সে সমস্ত মামলায় কোন সাজা হলে তা একযোগে ভোগের পরিবর্তে একাদিক্রমে ভোগের আইন করা। সেক্ষেত্রে প্রথমে গুরুতর শাস্তি পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত লঘু শাস্তি ভোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এর মাধ্যমে কৃত অপরাধ যে লঘু এবং সাধারণ নয় তা প্রমান করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রমে কেউ জড়ানোর পূর্বে এর পরিণতির ভয়াবহতা যেন বুঝতে পারে সে জন্য এটি প্রয়োজন।
১৩. তৃতীয় দেশে অবস্থানকারী অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই দেশের আইনে মামলা করা যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা।
১৪. যে সব দেশ অন্য কোন দেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরূদ্ধে অপরাধের বিচার করতে পারে সেসমস্ত দেশে অন্য দেশে অবস্থানকারী অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরূদ্ধে মামলা করা যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা।
এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে অপরাধীদের অন্য দেশে আশ্রয় বা অন্য দেশ থেকে সাহায্য পাবার সুযোগ সঙ্কুচিত হবে।
১৫. এই বিচার কার্যক্রমের বিরূদ্ধ প্রচারণাকারীদের বিরূদ্ধে ফৌজদারী দণ্ডবিধিতে অভিযোগ আনয়ণের ও বিচার করার ব্যবস্থা গ্রহন করা।
এর মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে অব্যাহত ও নির্বিঘ্ন করা যাবে।
১৬. দেশে ও দেশের বাইরে মামলা করা ও বিচার পরিচালনার উদ্যোগ মূলতঃ সরকারের হাতে রাখা। সরকার কোথাও কোন সাপোর্ট, লজিস্টিকস বা দলিল দিতে ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করা। সরকার কোন ক্ষেত্রে উৎসাহী না হলে সেক্ষেত্রে জনমত সৃষ্টি করে সরকারকে অবহিত করা। সরকার কোন ক্ষেত্রে উদ্যোগী না হলে উদ্যোগ গ্রহন করা।
বিচার প্রক্রিয়াটিকে একমূখী ও লক্ষাভিসারী করার জন্য এটি দরকার। নানা ধরণের মামলার গোলমালে কেউ যেন সুযোগ নিতে না পারে এটি তা নিশ্চিত করবে। ভবিষ্যতে সরকারের ইচ্ছায় ভিন্নতা ঘটলেও জনগণের উদ্যোগে বিদ্যমান মামলা বা তার আলোকে নতুন মামলা চালানো সম্ভব হবে।
১৭. বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা, তার বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টসমূহ স্থগিত রাখা। তবে তার পরিবারের সদস্যদের ও তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন, নিরাপত্তা ও চলাচল নিশ্চিত করা।
এর মাধ্যমে বিচার কার্যকে নিশ্চিত করা, অপরাধীর পলায়ন ঠেকানো এবং অপরাধীর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ নিশ্চিত করা যাবে।
১৮. সব ধরণের মিডিয়ায় বিচারের গতিপ্রকৃতি ও রায় নিয়ে আগাম আলোচনা, মতামত প্রদান বন্ধ করতে হবে। বিচারকার্য প্রভাবিত হয় বা মাননীয় বিচারকগণ বিব্রত হন এমন আলোচনা, সভা, মিছিল, পোস্টারিং, লিখন বন্ধ করতে হবে।
এর মাধ্যমে বিচারকার্যের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনমনে কোন প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারবেনা, মাননীয় বিচারকদের উপর ও অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা রোধ করা যাবে।
খুব স্বাভাবিকভাবে আমার ভাবনাতে অসম্পূর্ণতা, অজ্ঞতা বা প্রমাদ থাকতে পারে। এই ব্যাপারে পাঠকের সুচিন্তিত মতামত প্রত্যাশা করছি।
২০১০-০১-১৭
Keywords/








