যুদ্ধাপরাধীদের ৪ স্তরের প্রাথমিক তালিকা
এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তুত হবে চূড়ান্ত তালিকা
যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের সহযোগীসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। আরো যাচাই-বাছাই শেষে এক সপ্তাহের মধ্যেই তালিকাটি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। আর এ তালিকা ধরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করা হবে বলে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এদিকে বিচার কাজ শুরুর আগে তালিকাভুক্তরা যাতে বিদেশে পালাতে না পারে সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালের তালিকা, মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা সংগঠনগুলো ও গোয়েন্দা সংস্থার এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধান এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত যাচাই-বাছাই করে চার ভাগে নতুন এ তালিকাটি করা হচ্ছে। তালিকার প্রথমে রাখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী যারা নারী ধর্ষণ, গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের। দ্বিতীয় স্তরে রাখা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে জোট বেঁধে দেশব্যাপী সংগঠন তৈরি করেছে ও নির্যাতন চালিয়েছে। তালিকার তৃতীয় পর্যায়ে রাখা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী ধর্ষণ ও রাজাকারের নাম ধারণ করে বিভিন্ন এলাকায় লুটপাটকারীদের। আর চতুর্থ পর্যায়ে থাকছে স্বাধীনতাবিরোধীদের নানাভাবে সহযোগিতাকারীদের নাম।
১৯৭৩ সালের তালিকা, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মতো মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় এক হাজার রাজাকার ও আলবদরের নাম রয়েছে। তথ্য মতে, তিন সংগঠনের তালিকার সঙ্গে সরকারের তালিকার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে।
তিন সংগঠনের তালিকায় ছয়জনকে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠিত করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতা, রাজাকার বাহিনীর প্রধান উদ্যোক্তা ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম, পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আল-বদর বাহিনীর ঢাকা মহানগরীর প্রধান এবং বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ও আল-বদর বাহিনীর প্রধান উদ্যোক্তা এবং জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার নেতা, মুক্তিযুদ্ধকালীন জামালপুরের প্রথম আল-বদর বাহিনীর উদ্যোক্তা ও সংগঠক এবং বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধকালীন খুলনার রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নায়েবে আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজশাহীর কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আয়েন উদ-দীন।
যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় তৎকালীন শান্তি কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২১ জন রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সিনিয়র নায়েবে আমির আব্বাস আলী, মুক্তিযুদ্ধকালীন জয়পুরহাটের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম, জামায়াতের মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, চাঁদপুরের মৃত মাওলানা আব্দুল মান্নান, মরহুম আনোয়ার জাহিদ, জামায়াতের বর্তমান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, নারায়ণগঞ্জের মরহুম এ এস এম সোলায়মান, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তাঁর বাবা তৎকালীন মুসলিম লীগ সভাপতি মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরী, পাবনার জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুস সোবহান, বাগেরহাটের মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ও কুমিল্লার এ বি এম খালেক মজুমদার। এ ছাড়া এ তালিকায় সৈয়দ খাজা খায়েরুদ্দিন, এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, মাহমুদ আলী, আব্দুল জব্বার খদ্দর, মাওলানা সিদ্দিক আহমদ, আবুল কাশেম, মোহন মিয়া, মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুম, আব্দুল মতিন, অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার, ব্যারিস্টার আফতাব উদ্দিন, পীর মোহসেন উদ্দিন, এ কে রফিকুল হোসেন, নুরুজ্জামান, আতাউল হক খান, তোয়াহা বিন হাবিব, মেজর (অব.) আফসার উদ্দিন, দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী ও হাকিম ইরতেজাউর রহমান খানের নামও রয়েছে।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান জানান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্যই কমিটি দীর্ঘ ১৭ বছর ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে। তদন্ত কাজে কারো প্রতি কোনো প্রতিহিংসা কাজ করেনি। প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের শনাক্ত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কমিটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু করার জন্য এ তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এরা যেন কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবীর বলেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিশন দেশব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ১৯৭১ সালের নথিপত্র দেখে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা তৈরি করেছে। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
আগামী মার্চেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তাদের বিচার করা আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং দেশের জনগণের দাবি। আমরা সেই দাবি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।’
যুদ্ধাপরাধীরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সে জন্য সাত থেকে আট মাস আগেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কালের কণ্ঠকে জানান, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই দেশের বাইরে যেতে পারেননি। বিচার কাজ শুরু হবে শুনে অনেকেই পালানোর চেষ্টা করেছেন মন্তব্য করে তিনি জানান, এখনো তাদের সে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আরো কঠোর সতর্ক থাকবে সরকার।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কারা যুদ্ধাপরাধী তা সবাই জানেন। অন্তত ৫০ জনের নাম ১০ বছরের শিশুটি পর্যন্ত জানে। তিনি জানান, সরকারের কাছে একটি তালিকা রয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের জুন-জুলাই মাসেই বিচার কাজ শুরুর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমেই একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের একটি তালিকা করানো হয়। ওই তালিকায় দেড় হাজারের বেশি সরাসরি এবং সহযোগী হিসেবে আরো কয়েক হাজারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই তালিকা থেকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী এক হাজার জনের একটি তালিকা করা হয়। সর্বশেষ গত নভেম্বরের শেষ দিকে আরো যাচাই-বাছাই ও অপরাধের পর্যায়সহ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।
Keywords/








